বগুড়ার আলোচিত তুফানের কর্মযজ্ঞ।

FB_IMG_1501446084973_1_1.jpg

আনিসুর রহমান::বগুড়ায় এক ভয়ংকর নাম তুফান সরকার। ক্ষমতার বলয়ে তাদের পরিবার বলে টু শব্দটি করার জো নেই তাদের বিরুদ্ধে। বড় ভাই বগুড়া শহর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন সরকার। স্ত্রীর বড় বোন স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর। এলাকাবাসী ও রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সে এমনই কোনঠাসা করে রেখেছে যে ভয়ে তার বিরুদ্ধে কেউ কোনও কথাও বলে না। প্রশাসনও অজ্ঞাত কারণে তার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয় না।

তুফানের উত্থান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর। প্রথমদিকে তেমন আলোচনায় না থাকলেও মাদক ব্যবসায় তার পরিবার জড়িত কয়েক দশক ধরেই। সেই সুযোগটাকে কাজে লাগাতে ২০১৫ সালে শহর শ্রমিক লীগে যোগ দেয় সে। এরপর সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে প্রশাসনের নাকের ডগায় মাত্র দুই বছরেই কোটিপতি হয়ে যায় তুফান ও তার পরিবার।

বগুড়া শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক ও কিশোরী ছাত্রী ধর্ষণের হোতা তুফান শাসক দলের শ্রমিক সংগঠন শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়কের পদকে হাতিয়ার করে নিজের নামে গড়ে তুলেছেন ‘তুফান বাহিনী’।

পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসা, দখলবাজি ও বাণিজ্যমেলায় জুয়ার আসর বসিয়ে টাকা কামিয়েছেন দুই হাতে। তিনি এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। বাবা মজিবর রহমান রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করলেও তার ছেলে তুফান থাকেন বিলাসবহুল বাড়িতে, চড়েন দামি গাড়িতে।

বগুড়ায় এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও মাসহ তার মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার ঘটনায় শুক্রবার (২৮ জুলাই) গ্রেফতার হওয়ার আগে বগুড়া শহরের মানুষ তুফান সরকারকে চিনতো ‘শহরের ত্রাস’ হিসেবে। রোববার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন তাঁর। এ ঘটনা তোলপাড় পড়ে যাওয়ায় সংগঠন থেকে তাঁকে বহিষ্কারও করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বগুড়া শহরের চকসুত্রাপুর কসাইপাড়া এলাকার ক্ষুদে ব্যবসায়ী মজিবর রহমান সরকারের আট ছেলের মধ্যে সবার ছোট তুফান সরকার। ২৪ বছর বয়সী তুফান পারিবারিকভাবে চমড়া ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হলেও ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তার বড় ভাই যুবলীগ নেতা মতিন সরকারের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

বড় ভাই আব্দুল মতিন বগুড়া শহর যুবলীগের যুগ্মসম্পাদক হওয়ায় রাজনীতিতে তুফান সরকারের দ্রুত উত্থান ঘটে। এক সময় তিনি মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। সেই ব্যবসা নিবিগ্নে চালাতে গড়ে তুফান বাহিনী

২০১২ সালের ৪ এপ্রিল তুফানকে ইয়াবা ও ফেন্সিডিলসহ গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তিনি জামিনে বেড়িয়ে আসেন। একই বছরের ২০ জুলাই একটি হত্যা চেষ্টা মামলায় তুফান এবং তার তিন ভাই ঝুমুর, ওমর ও সোহাগ গ্রেফতার হয়। তবে কোনো বারই তাদের বেশি দিন জেলে কাটাতে হয়নি।

২০১৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ইমরান হোসেন নামে প্রতিবেশী এক যুবদল নেতা খুন হন। ইমরানের মা তার ছেলে হত্যাকাণ্ডে তুফান ও তার ভাইদের জড়িত থাকার অভিযোগ করেন।

আক্ষেপ করে ইমরানের মা বলেন, ‘পুলিশ কখনোই এই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। যদি নিত তাহলে ইমরানকে মরতে হতো না।’

একাধিক মামলার আসামি তুফান সরকার এক সময় জাতীয় শ্রমিক লীগে যোগদান করেন। তাকে ওই সংগঠনের বগুড়া শহর শাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর তিনি সংগঠনের ওই পদবি ব্যবহার করে শহরে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার রিকশা-ভ্যান মালিক সমিতির নেতৃত্ব নেন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা শ্রমিক লীগের একজন নেতা জানান, তুফান সরকার ২০১৫ সালে শহরের চকসূত্রাপুর এলাকায় বাণিজ্য মেলায় নামে প্রায় দেড় বছর জুয়ার আসর পরিচালনা করে। এখানে কয়েক কোটি টাকা আদায় করে সে। তার বিরুদ্ধে চোরাই গাড়ি কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। দলের নাম ও পদ ভাঙিয়ে প্রায় দু’বছর বগুড়া শহরে অন্তত ১০ হাজার ব্যাটারিচালিত ইজি বাইকে চাঁদাবাজি করেছে তুফান। তার স্টিকার ছাড়া বগুড়া শহরে কোনও রিকশা চলতো ।

এলাকাবাসী জানান, তুফান ও তার পরিবারের অনেক সদস্যের মাদক ব্যবসা সম্পর্কে সবাই জানেন। তারা মাদক ব্যবসায়ী পরিবার ছাড়া সন্তানদের বিয়ে দেন না বগুড়ায় এটাও সবার মুখে মুখে প্রচারিত। এমন দেখা গেছে, কিছুদিন আগে যারা মানুষের কাছে হাত পেতে চেয়ে খেতেন, তুফানদের সঙ্গে আত্মীয়তার সুবাধে তারা এখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে ঘুমান।

এক কিশোরীকে ভালো কলেজে ভর্তির প্রলোভন দেখিয়ে ১৭ জুলাই ও পরে কয়েকবার ধর্ষণ করেন শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক তুফান। এ কাজে তাকে সহায়তা করেন তার কয়েকজন সহযোগী।

বিষয়টি জানতে পেরে তুফানের স্ত্রী আশা ও তার বড় বোন বগুড়া পৌরসভার সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মার্জিয়া হাসান রুমকিসহ ‘একদল সন্ত্রাসী’ শুক্রবার দুপুরে ওই কিশোরী এবং তার মাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাদের মারধর করে নাপিত দিয়ে মা ও মেয়ের মাথা ন্যাড়া করে দেন। ধর্ষণের শিকার মেয়েটি এবার বগুড়া শহরের একটি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।

ওই ঘটনায় ধর্ষিতা কিশোরীর মা মুন্নী বেগম বাদী হয়ে বগুড়া সদর থানায় নারী নির্যাতন ও অপহরণের অভিযোগে পৃথক ধারায় দুইটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলা দুইটিতে মোট ১০ জনকে আসামী করা হয়েছে। এরপর রাতেই তুফান এবং আতিকুর রহমান আতিক, আলী আজম দিপু ও রূপম নামের তার তিন সহযোগীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

মামলার প্রধান আসামি তুফান এবং তার দুই সহযোগী দিপু ও রূপমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রোববার তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত।

পুলিশের গণমাধ্যম শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সনাতন চক্রবর্তী জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত তুফান সরকার ওই কিশোরীকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে। থানা হাজতে আটক আতিক নামে তার সহযোগী সাংবাদিকদের জানিয়েছে ওই কিশোরী যাতে গর্ভবতী হয় সেজন্য ধর্ষণের আগে তাকে গর্ভনিরোধক ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল।

এদিকে রবিবার (৩০ জুলাই) রাতে সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তুফান সরকারের স্ত্রী পলাতক আশা সরকার, তুফানের সহযোগী মুন্না, তুফানের গাড়িচালক জিতু কে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এর আগে বগুড়া গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল রোববার সন্ধ্যায় পাবনা শহর থেকে তুফানের স্ত্রী আশা খাতুনের বড় বোন রুমকি ও তুফানের শাশুড়ি রুমা খাতুনকে গ্রেপ্তার করে।

এদিকে ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে তুফান সরকারকে শ্রমিক লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

Comments

comments

Top