সব চেয়ে ছোট বয়সে এইচএসসি পাশ!

165155b8.jpg

কুমিল্লা প্রতিনিধিঃ- ২০০৯ সালে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পঞ্চম শ্রেণির লেখাপড়া শেষ করে দেশের অনেক সংবাদ মাধ্যমে ‘পাঁচ বছরের সব জান্তা রাতুল’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই সংবাদের মাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টিকারী কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার রাতুল আলম এবার ১৩ বছর বয়সেই এইচএসসি পরীক্ষা পাশ করে আবারও তাক লাগিয়েছে।

চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় প্রকাশিত ফল অনুযায়ী চান্দিনা রেদোয়ান আহমেদ কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে নিয়মিত ১৫ জন ছাত্র পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও জিপিএ ৪.০৮ পেয়ে একমাত্র পাশ করেছে ১৩ বছরের শিক্ষার্থী রাতুল আলম। সে চান্দিনা উপজেলা সদরের হাসপাতাল রোডের ডা. মোর্সেদ আলম ও মাতা নাছরিন আলমের বড় ছেলে।

জানা যায়, ২০০৪ সালের ২১ জানুয়ারি জন্ম রাতুলের। ২০০৯ সালে মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই পঞ্চম শ্রেণির লেখাপড়া শেষ করে ওই শিশু। যে বয়সে শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি শুরু হয় সেই বয়সে ডা. মোর্শেদ আলম ও তার স্ত্রী ছেলেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি করাতে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ঘুরে বেড়ান। শিক্ষকদের সব প্রশ্নের উত্তর রাতুল দিতে পারলেও সরকারি বিধি না থাকায় ২০১০ সালে ছয় বছর বয়সে পঞ্চম শ্রেণিতে তাকে ভর্তি করা সম্ভব হয়নি। ফলে ২০১১ সালে পার্শ্ববর্তী দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর ‘ভয়েজার ইংলিশ মিডিয়াম’ নামের একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ওই বছর প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় পাশ করে রাতুল।
২০১২ সালে চান্দিনার কেরনখাল উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ওই বছর জুনিয়র সার্টিফিকেট পরীক্ষায় পাশ করে ২০১৩ সালে সে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে ১১ বছর বয়সে একই স্কুল থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় ‘এ গ্রেড’ পেয়ে উত্তীর্ণ হয় শিশু রাতুল। ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে চান্দিনা রেদোয়ান আহমেদ কলেজে ভর্তি হয়ে ২০১৭ সালে ওই কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সে। পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর চান্দিনা রেদোয়ান আহমেদ কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ১৫ জন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও একমাত্র রাতুল ছাড়া আর কেউ পাশ করেনি।

জিপিএ-৫ না পাওয়ায় হতাশ রাতুল। নির্ধারিত পয়েন্ট না থাকায় মেডিক্যালে ভর্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তার। এ নিয়ে শিক্ষা পদ্ধতিকে দায়ী করেন তার অভিভাবক।
রাতুলের মা নাছরিন আলম জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে যায়নি রাতুল। ছোটবেলায় মুখে কথা ফোটার পর থেকেই তার পড়ালেখা শুরু হয়। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই সে পঞ্চম শ্রেণির ইংরেজি, গণিত থেকে শুরু করে পুরো সিলেবাস শেষ করে। তাই ২০১০ সালে তাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কোনও বিদ্যালয়ই তাকে ভর্তি করাতে চায়নি। অবশেষে বেলাশহর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভর্তি করানোর জন্য আশ্বাস দিলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অনুমতি চেয়েছিলেন। এ দেশের শিক্ষা পদ্ধতিতে ছয় বছরের নিচে কোনও শিশুকে প্রথম শ্রেণিতেই ভর্তি করা সম্ভব না বিধায় চান্দিনার ইউএনও রাতুলকে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তির অনুমতি দেয়নি। বাধ্য হয়ে পরের বছর দাউদকান্দি উপজেলা থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি করাই। ২০১২ সালের মধ্যে সে অষ্টম শ্রেণির সিলেবাস সমাপ্ত হলে ওই বছর তাকে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি করাই। সে বছর জেএসসি পাশ করে আর থেমে থাকতে হয়নি তাকে। ২০১৫ সালে এসএসসি ও ২০১৭ সালে এইচএসসি পাশ করে রাতুল আলম।
রাতুলের মা আরো বলেন, “আমার ছেলে মেডিক্যাল বা ইঞ্জিনিয়ারিং যে কোনও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারলে অবশ্যই চান্স পাবে। কিন্তু সরকারের পয়েন্টভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতিতে আবেদন করারই কোনও সুযোগ নেই। ফলে তার স্বপ্ন বদলাতে হচ্ছে। কুমিল্লা বোর্ডের ফল বিপর্যয়ের পরও আমার ছেলে এইচএসসিতে ৪.০৮ পেয়েছে তাতেই খুশি থাকতাম, যদি মেডিক্যালে আবেদনের সুযোগ থাকতো। ফল বিপর্যয়ের কথা চিন্তা করে পয়েন্টের বিষয়টিও বিবেচনা করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান রাতুলের মা নাছরিন আলম।
রাতুল এর বাবা ডা. মোর্শেদ আলম বলেন, “সরকার সব সময় বলে আসছে, লেখাপড়ার বয়স নেই। কিন্তু আমার ছেলেকে নিয়ে ভর্তি থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিড়ম্বনায় পড়েছি। আট বছর বয়সে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি করানোর জন্য যেখানেই গিয়েছি সেখানেই বিড়ম্বনায় পড়েছি। অবশেষে তার জন্ম সনদ, অষ্টম শ্রেণির পাশের সনদ ও সিভিল সার্জন কর্তৃক ডাক্তারি সনদ নিয়েও ওই বয়স দেখিয়ে অষ্টম শ্রেণির রেজিস্ট্রেশন করতে পারিনি। বাধ্য হয়ে তার নির্ধারিত বয়সের চেয়ে আরও চার বছর বাড়িয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়েছে। পয়েন্ট ও বয়স জটিলতায় আমার ছেলের মতো দেশের আরও অনেক মেধাবি শিক্ষার্থী তাদের মেধা যাচাই করতে পারছে না। এ ব্যাপারে সরকারের শিক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন চান ডা. মোর্শেদ আলম।
চান্দিনা রেদোয়ান আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, “রাতুলের বয়স ১৩ বছরের বেশি হবে না। কিন্তু শিক্ষা পদ্ধতির কারণে তার বয়স বাড়াতে হয়েছে। সার্টিফিকেটে তার বয়স বাড়ালেও তাকে যে কেউ দেখলেই প্রকৃত বয়স অনুমান করতে পারবে। রাতুল আমাদের কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে একমাত্র পাশ করা ছাত্র। আমরা কলেজ কর্তৃপক্ষ তার জন্য দোয়া কামনা করি। ”

Comments

comments

Top