এশিয়ার জন্য বড় সংকট

87b57283d330845f53d001f9078beb6d-595be9a02f7b3.jpg

কাতার ও তার শাসনাধীন পশ্চিম এশীয় অঞ্চলে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রভাব এশিয়াজুড়ে ইতিমধ্যে অনুভূত হচ্ছে। যেসব এশীয় কোম্পানি কাতারে বিনিয়োগ করেছিল, তাদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে, আঞ্চলিক স্টক মার্কেটের ফলাফল দেখে তা বোঝা যাচ্ছে। এ ছাড়া এই সংকটের প্রভাব খুবই সুদূরপ্রসারী হবে, যেটা আমরা কেবল বুঝতে শুরু করেছি। শুধু প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিকারকদের ওপরই নয়, আরও অনেকের ওপরই এর প্রভাব পড়বে।

জুন মাসের শুরুর দিকে আফ্রিকা ও এশিয়ার নয়টি দেশ কাতারের সঙ্গে সব কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। অন্যদিকে জিবুতি ও জর্ডান কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক হ্রাস করে। এই গোষ্ঠী কাতারের সঙ্গে বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই প্রদর্শনীর লক্ষ্য হচ্ছে কাতার যেন হামাসসহ অন্যান্য ইসলামি গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করে। দোহা বহুদিন ধরে মুসলিম ব্রাদারহুডকে সমর্থন দিয়ে আসছে, তারা ইউসুফ আল-কারাদাওয়িকে নাগরিকত্ব দিয়েছে। এই বিতর্কিত পণ্ডিত আত্মঘাতী বোমা হামলার সাফাই গান।

কাতার স্বীকার করেছে, তাদের সঙ্গে বেশ কিছু ন্যক্কারজনক গোষ্ঠীর সম্পর্ক আছে। কাতার সরকারের ভাষ্যমতে, তার এই সম্পর্কের মাজেজা হচ্ছে আঞ্চলিক বিবাদে মধ্যস্থতার অংশ হিসেবে তারা এই সম্পর্ক বজায় রাখে। তবে সংকটের মধ্যেও কাতারের আমির ইফতার অনুষ্ঠানে আল-কারাদাওয়িকে দাওয়াত দেন এবং তিনি তাতে যোগ দেন।

এশীয় দেশগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত মালদ্বীপ এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের খেলায় যোগ দিয়েছে। এই দেশটির অভিজাত শ্রেণির মানুষেরা ক্রমেই সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রভাববলয়ে ঢুকে যাচ্ছেন। মালদ্বীপের মুসলমান তরুণেরা চরমপন্থায় দীক্ষিত হচ্ছেন, যা নিয়ে দেশটির সরকার উদ্বিগ্ন। জনসংখ্যার অনুপাতে এই দেশটির তরুণেরাই সিরিয়া ও ইরাকে সবচেয়ে বেশি যুদ্ধ করতে গেছেন। দিল্লিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সোসাইটি ফর দ্য স্টাডি অব পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্টের নির্বাহী পরিচালক অনিমেশ রাউল বলেছেন, মালদ্বীপে যেমন ইউসুফ আল-কারাদাওয়ির অনুসারী আছে, তেমনি মুসলিম ব্রাদারহুডেরও আছে। বিশেষ করে মালদ্বীপের বিরোধী দল আদালত পার্টি মুসলিম ব্রাদারহুড দ্বারা প্রভাবিত। এতে পরিবর্তন আসতে পারে, কিন্তু অন্যান্য চরমপন্থী গোষ্ঠীর উত্থানে মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শ কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

এ ছাড়া কাতারের ব্যাপারে অধিকাংশ এশীয় দেশের মূল ভাবনার কারণ হচ্ছে প্রাকৃতিক গ্যাস, সন্ত্রাসবাদ নয়। কাতার বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারক (এলএনজি), এই গ্যাসের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ যায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া,
ভারত, তাইওয়ান, চীন ও থাইল্যান্ডে। অন্যদিকে ভারত একাই কাতারের প্রাকৃতিক গ্যাসের ৬৫ শতাংশ আমদানি করে।

এসব চুক্তি সাধারণত দীর্ঘ মেয়াদে হয়ে থাকে, যার বাজারের বেশির ভাগটাই আঞ্চলিক। সম্প্রতি পূর্ব এশিয়া এই গ্যাসের সবচেয়ে বেশি দাম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যে এলএনজির বাণিজ্য হয়, তার এক-তৃতীয়াংশের উৎপত্তি কাতারে। ফলে এশীয় দেশগুলোর পক্ষে কাতারের বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন, যেটা তেলের ক্ষেত্রে হয়নি। এসব চুক্তি মেনে চলার সামর্থ্য কাতারের থাকায় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হয়তো এড়ানো যাবে। ইরান হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করে, আর এই সংকটের কারণে কাতার-ইরাক সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে।

চুক্তি নিয়ে আলোচনার সময় এলে কাতারের এলএনজির দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতারা অন্য উৎসের সন্ধান করতে পারে। স্বল্পমেয়াদি বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে। ফলে এই দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতাদের অনেকে ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার দ্বারস্থ হতে পারেন, যাঁরা উভয়েই এলএনজি রপ্তানি করেন।

কথা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রপ্তানিকারক হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাসের বাণিজ্যে কাতারের ভূমিকা অস্বীকার করার জো নেই। হিলিয়াম বাজারেও কাতারের একই রকম প্রভাব আছে। যুক্তরাষ্ট্রের পর তারাই পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম হিলিয়াম উৎপাদক। কাতারের এলএনজি রপ্তানি এখনো আছে, কিন্তু তাদের হিলিয়াম রপ্তানি একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে।

নিষেধাজ্ঞার জবাবে কাতার সৌদি আরবে হিলিয়াম রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। এতে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। আগে যেটা হতো তা হলো, কাতারের রপ্তানিকৃত হিলিয়ামের বেশির ভাগ অংশ সৌদি আরবের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন বন্দরে নিয়ে যাওয়া হতো। হিলিয়াম তো অনেক কিছুতেই ব্যবহৃত হয়—বাচ্চাদের জন্মদিনের বেলুন থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পর্যন্ত। সবচেয়ে হালকা দাহ্য এই গ্যাসটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এশীয় দেশগুলো হিলিয়াম দিয়ে ইলেকট্রনিকস পণ্য, সেমিকন্ডাক্টর, ফাইবার অপটিকস ও নানা শিল্পদ্রব্য বানিয়ে থাকে। এদিকে নিষেধাজ্ঞার আগে হিলিয়ামের বাজার বছরে ২ শতাংশ হারে বাড়ছিল। এখন আমদানিকারকেরা অন্য উৎস খুঁজলেও কাতারের এই সিদ্ধান্তে বাজারে বড় প্রভাব পড়বে।

এশীয় দেশগুলোর কাছে কাতার সংকটের আরেকটি মাত্রাও আছে, কারণ বহুদিন ধরে তাদের দেশের শ্রমিকেরা কাতারে যাচ্ছেন। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমিকদের যাওয়ার জায়গা হচ্ছে কাতারসহ আশপাশের আরব দেশগুলো। বস্তুত দক্ষিণ এশীয় নাগরিকেরাই উপসাগরীয় দেশগুলোতে বেশি যায়।

শ্রমবাজারেও এর প্রভাব অনুভূত হতে শুরু করেছে। ফিলিপাইন সাময়িক সময়ের জন্য শ্রমিকদের দোহায় যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে ভিয়েতনাম। কাতার চেষ্টা করছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের অতিথি শ্রমিকেরা যেন নিষেধাজ্ঞার সময় দেশ ছেড়ে যেতে না পারে। নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘায়িত হলে কাতারের নির্মাণশিল্পের অগ্রগতি শ্লথ হয়ে যাবে। ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনে তাকে এই অবকাঠামো নির্মাণ করতেই হবে।

যাহোক, এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে না কাতারের সংকট থেকে উন্মুক্ত দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হবে। তেমন নজিরও কিন্তু আছে, আমরা জানি, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব ২০১৪ সালে আট মাসের জন্য তাদের রাষ্ট্রদূতদের কাতার থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বিশ্বাস করে, নিষেধাজ্ঞা ও ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কাতার একসময় নতি স্বীকার করবেই। সংকট সমাধানের লক্ষ্যে কাতার মুসলিম ব্রাদারহুডের কিছু নেতাকে ফেরত পাঠাতে রাজি হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী দেশগুলো জুনের শেষ দিকে ১৩টি দাবি তুলেছিল, যার মধ্যে আছে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ থেকে শুরু করে দেশটির রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম কোম্পানি আল-জাজিরা বন্ধ করে দেওয়া। এই দাবির কারণ কাতারের কাছে বোধগম্য নয়। তবে এতে অচলাবস্থা নিরসনে আলোচনার ভিত্তি পাওয়া যায়।

অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে নেওয়া।

জোসেফ হ্যামন্ডআমেরিকান মিডিয়া ইনস্টিটিউটের ফেলো

Comments

comments

Leave a Reply

Top