ইতিহাস হয়ে ওঠা তরুণ নায়কেরা

01795025d8608790b61ab81c81c494d0-595545e2bd338.jpg

রুমী যখন ইউওটিসির (এখনকার বিএনসিসি) পোশাকে। ছবি: সংগৃহীত

প্রেরণার তারুণ্য: বাংলাদেশের আত্মত্যাগী নায়কেরা বইয়ের সংক্ষিপ্ত ভূমিকায় সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ যখন বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি সোপান তারুণ্যের রক্তে রঞ্জিত। যেখানেই প্রতিবাদ, সংগ্রাম আর লড়াই, সেখানেই বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন আমাদের তরুণেরা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে, ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায়, স্বাধীনতার যুদ্ধে, মানুষের অধিকার আদায়ের স্বপ্নে তাঁরা প্রাণ দিয়েছেন নির্ভয়ে।’—তখন আমাদের ইতিহাসের ধারাবাহিকতার একটি ছবি আমাদের চোখের সামনে দ্যুতিময় হয়ে ওঠে। আর আমরা দেখি সার বাঁধা সেই সব তরুণ-তরুণীর মুখ, যাঁদের আত্মত্যাগের ইতিহাস স্বর্ণাক্ষরে লেখা, যাঁদের বাদ দিয়ে বাংলাদেশের বাংলাদেশ হয়ে ওঠার—কল্পনা থেকে তার জাতিরাষ্ট্র হয়ে ওঠার পর্যায়ক্রমিক ইতিহাস অকল্পনীয়।

আলোচ্য বইয়ে যে ১৮ জন তরুণ-তরুণীর সংক্ষিপ্ত জীবনেতিহাস তুলে ধরা হয়েছে, তাঁদের কারোরই আত্মত্যাগের মহিমাকে কোনো বিচারেই খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জীবনকথা যখন পড়ি, তাঁর শিক্ষাজীবন, পারিবারিক পরিবেশ এবং সেই পরিবেশে বেড়ে ওঠা, দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ হওয়া, বিপ্লবী দলে যোগ দেওয়া, বিপ্লবী কাজে প্রস্তুতি নেওয়া—পরিশেষে ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করতে গিয়ে তাঁর আত্মাহুতি দেওয়ার ঘটনাসম্পৃক্ত বিবরণ যখন পাঠ করি, তখন শুধু রোমাঞ্চিতই হই না, এ তথ্য জেনেও অবাক হই যে প্রীতিলতা যখন আত্মাহুতি দিচ্ছেন, তাঁর বয়স সে সময় মাত্র ২১ বছর। পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাব যখন আক্রমণ করতে গিয়েছিলেন তিনি, তাঁর ‘পরনে ছিল খাকি শার্ট, ধুতি, মাথায় পাগড়ি ও কোমরে চামড়ার কটিবন্ধে রিভলবার। অভিযানের শেষ দিকে হঠাৎ একজন গুর্খা অফিসারের ছোড়া গুলিতে প্রীতিলতা লুটিয়ে পড়েন। নির্দেশ অনুযায়ী ধরা না দিয়ে মুখে পুরে দেন পটাশিয়াম সায়ানাইড।’ অবশ্য প্রীতিলতা ও তাঁর বিপ্লবী দলের সহকর্মীদের গুলিতে মোট ১২ জন ইউরোপীয় নারী-পুরুষ হতাহত হয়েছিলেন। আমরা আরও জানছি, ‘ওই দিন প্রীতিলতার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল তাঁর নিজের স্বাক্ষর করা প্রচারপত্র…।’ প্রচারপত্রের একটি লাইন ছিল এমন, ‘আমার দেশের ভগিনীরা আজ নিজেকে দুর্বল মনে করিবেন না।’ একজন প্রীতিলতা ইতিহাসের চরিত্র হয়ে ওঠেন এভাবেই। আর প্রীতিলতাকে নিয়ে আহমেদ মুনিরের লেখাটিও চমৎকার।

কথাসাহিত্যিক সোমেন চন্দের জীবন ছিল কমিউনিস্ট আদর্শবাদের অনুসারী। করতেন কমিউনিস্ট পার্টি, রেলশ্রমিক ইউনিয়নও। কিন্তু তাঁর ‘আসল কাজ ছিল লেখালেখি’। তাঁকে নিয়ে নিবন্ধের লেখক জাকির তালুকদার আমাদের জানাচ্ছেন, ‘বাংলা ভাষায় “দাঙ্গা” নিয়ে প্রথম গল্পটির লেখকও সোমেন চন্দ।’ ক্রমে প্রগতি লেখক সংঘেরও সক্রিয় সংগঠক হয়ে উঠেছিলেন তিনি। এবং যখন সাহিত্য রচনায়, বিশেষত ছোটগল্প রচনায় তিনি আমগ্ন, তখনই গুন্ডাদের ছুরিকাঘাতে নৃশংসভাবে নিহত হন। তারিখ ১৯৪২ সালের ৮ মার্চ। তাঁর বয়স তখন মাত্র ২২ বছর। মনে রাখা দরকার, সোমেন চন্দ নিহত হন তাঁর রাজনৈতিক আদর্শবাদানুসারী কর্মতৎপরতার কারণেই। সাড়া ফেলে দিয়েছিল তাঁর এই মৃত্যুর ঘটনা। ঢাকার দক্ষিণ মৈশুন্ডীতে বসবাসকারী সোমেন চন্দ তাঁর মৃত্যুর ভেতর নিয়ে সমগ্র বাংলার প্রগতিশীল নেতা-কর্মী ও তাঁদের অনুসারীদের হৃদয়ের গভীরে ঠাঁই করে নিয়েছিলেন।

ঠিক একইভাবে আমরা শিহরিত হই রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে বন্দী অবস্থায় পুলিশের ছোড়া গুলিতে আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুর বিবরণ পড়ে। কে এই আনোয়ার হোসেন? ইসমাইল সাদীর ভাষায়, ‘তিনি বর্তমান প্রজন্মের কাছে হয়তো বিস্মৃতপ্রায়। কিন্তু ইতিহাস সচেতন পাঠকের কাছে আনোয়ার হোসেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিপ্লবীর নাম, সহকর্মীদের কাছে প্রাণচঞ্চল মেধাবী এক সম্ভাবনাময় ক্ষণজন্মা টগবগে তরুণের নাম, আর তৎকালীন বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছে নিরন্তর এক অনুপ্রেরণার নাম।’

এই বইয়ের যেসব আত্মত্যাগী তরুণ-তরুণীর জীবন আলোকিত হয়েছে, তাঁদের কারোর জীবনই ইতিহাসের বাইরের নয়। এখানে রয়েছে মোট ১৮টি নিবন্ধ। নিবন্ধগুলোর প্রতিটিই সুখপাঠ্য। উপরন্তু বাংলাদেশের আত্মত্যাগী নায়কদের নানা খুঁটিনাটি তথ্য সমৃদ্ধ করবে পাঠকদের। ভাষাশহীদ আবুল বরকত ও আবদুস সালাম, উনসত্তরের আইয়ুববিরোধী গণ-আন্দোলনের শহীদ আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ও মতিউর রহমান মল্লিক, এরশাদের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের শহীদ রাউফুন বসুনিয়া, নূর হোসেন, শামসুল আলম খান মিলন, সেলিম ইব্রাহিম, মহান মুক্তিযুদ্ধের অগ্রসারির সৈনিক ও বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান, অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য, মেহেরুন্নেসা, শাফি ইমাম রুমী, আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল এবং দেশের ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে নিহত অথবা অপহৃত কল্পনা চাকমা ও ফারাজ আইয়াজ হোসেনের বীরত্বসূচক আত্মত্যাগের বৃত্তান্ত পড়ার পর হৃদয়ে কেবল বেদনাই জাগে না, প্রেরণাদীপ্তও হই এই ভেবে যে নৈতিকতা-জারিত সাহসের মৃত্যু নেই। এ বইয়ের প্রতিটি নিবন্ধে উঠে আসা জীবনী তারই জ্বলজ্বলে সাক্ষ্য বহন করছে।

সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফের এই গ্রন্থ-পরিকল্পনা খুবই সময়োপযোগী। এমন একটি দুর্দান্ত বই প্রকাশ করার জন্য প্রথমা প্রকাশনকে অভিনন্দন।

Comments

comments

Leave a Reply

Top